চীনা বিনিয়োগের নতুন অধ্যায়: কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা

বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ এবং ভূ-রাজনীতির কৌশলগত মোড়ে দাঁড়িয়ে কোনো দেশের জন্য অর্থনৈতিক সচলতা ধরে রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মাঝে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থব্যবস্থা ও টেকসই শিল্পায়নে এক ইতিবাচক আশার আলো নিয়ে হাজির হয়েছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক আঞ্চলিক সংযোগ ও বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ। সম্প্রতি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় এক দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা হলো বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন)-এর নির্মাণকাজ। প্রায় ৭৮৩ থেকে ৮০০ একর জমিতে গড়ে উঠতে যাওয়া এই বিশেষায়িত জি-টু-জি (গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্ট) শিল্পাঞ্চল শুধু চট্টগ্রাম নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এক দশকে বহু আইনি জটিলতা, ডেভেলপার-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা অতিক্রম করার পর, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাবেই অবকাঠামোগত অগ্রগতি আলোর মুখ দেখেছে।

২০৩১ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার কথা। প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা এবং ১ লাখ মানুষের সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গঠিত এই ইকোনমিক জোনটি আসলে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তা বিশদ পর্যালোচনার দাবি রাখে।

কোনো দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো লজিস্টিক সাপোর্ট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা। আনোয়ারায় বাস্তবায়িত হতে যাওয়া চীনা ইকোনমিক জোনটি অবস্থানগত দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক কেন্দ্রগুলোর একটি। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে এর অবস্থান। কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত শিল্পপণ্য সরাসরি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত জাহাজীকরণ ও এয়ার-ফ্রেইটের মাধ্যমে পাঠানোর মতো এমন চমৎকার সুবিধা সত্যিই বিরল।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল নদীর ওপারে, অর্থাৎ দক্ষিণ চট্টগ্রামে, বিশ্বমানের শিল্পায়ন ও নগরায়ণ সুসংহত করা। কর্ণফুলী টানেলের ঠিক সঙ্গেই এই জোনের অবস্থান হওয়ায় টানেলটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে।

১,২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, ৩৩০ মিটার সেতু, চার লেনের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সড়ক এবং ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার একটি বহুমুখী জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা যুক্ত থাকায় এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করবে।

বহুমুখীকরণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো একক পণ্যের ওপর অতি-নির্ভরতা। রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, যদি এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কেবল পোশাক বা টেক্সটাইলের সাধারণ কারখানা তৈরি হয়, তবে দেশের সার্বিক অর্থনীতি অতিরিক্ত সুফল পাবে না। তবে আশার কথা হলো, সরকার ও বেজার পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে কেমিক্যাল, ওষুধ, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক্স, আইটি এবং রপ্তানিমুখী ভারী শিল্প স্থাপনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

আমাদের দেশের পোশাক কারখানাগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ কাপড়, রঙ, কেমিক্যাল ও অ্যাকসেসরিজ এখনো চীন থেকে আমদানি করতে হয়। এর ফলে দীর্ঘ সময় লাগে এবং সরবরাহ চেইনে বিপুল খরচ বাড়ে। যদি চায়নিজ ইকোনমিক জোনে চীন থেকে সরাসরি টেক্সটাইল কাঁচামাল, আধুনিক কেমিক্যাল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে, তবে এটি আমাদের আরএমজি খাতের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ কমিয়ে দেবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বহু গুণে বেড়ে যাবে।

গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কর্তৃক অনুমোদিত ৪,১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১,৭২২ কোটি টাকা এবং চীন সরকারের পক্ষ থেকে ২,৪৬৭ কোটি টাকার রেয়াতি ঋণ নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রকল্পটির অবকাঠামোগত ভিত্তি আধুনিক রূপরেখায় সাজানো হচ্ছে।

বিশ্ববাজারে ‘সবুজ শিল্পায়ন’ এবং ইএসজি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত না করলে আন্তর্জাতিক বাজার ধরা কঠিন। এই প্রকল্পের জন্য ২৫ এমএলডি ক্ষমতার সিইটিপি এবং কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা একটি বৈশ্বিক মানের ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। তরুণ ও শিক্ষিত বেকার গোষ্ঠী, কারিগরি ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের পাশাপাশি বিশাল এক অদক্ষ জনবলের নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে।

কেবল শিল্পের চাকা ঘুরবে না, আনোয়ারায় একই সঙ্গে উন্নত আবাসিক এলাকা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বিনোদনমূলক পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠবে। কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ে একটি নতুন কমার্শিয়াল ও রেসিডেন্সিয়াল সিটির জন্ম হতে চলেছে, যা রাজধানী ঢাকা কিংবা মূল চট্টগ্রাম শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ অনেকাংশে লাঘব করবে।

বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি অনুসরণ করে আসছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। জি-টু-জি মডেলের আওতায় এই প্রথম বিশেষায়িত একটি শিল্পাঞ্চল চীনের ডেভেলপার ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’ বাস্তবায়ন করছে।

বেইজিং ও ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক রোডশো এবং প্রধানমন্ত্রীর সফর পরবর্তী বৈঠকের সুবাদে ইতোমধ্যে ৩০টিরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিনিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সফলতার ওপর ভিত্তি করে আগামীতে ইউরোপ ও মার্কিন বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে বড় অঙ্কের অর্থ খাটাতে উদ্বুদ্ধ হবে।

এখানে আমি এই কথাও বলতে চাই যে, যেকোনো বিশাল অর্থনৈতিক প্রকল্পের ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু অবকাঠামোগত ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ থাকে। প্রকল্পটির মূল সুবিধা নিশ্চিতে বাংলাদেশকে নিচের বিষয়গুলোর প্রতি শতভাগ কঠোর ও নজরদারিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১. কাস্টমস প্রসেসিং, ট্যাক্স রেয়াত এবং বিভিন্ন লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই ভোগান্তির শিকার হন। বেজাকে সত্যিকার অর্থেই ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো নথি যেন ফাইলবন্দি না হয়ে থাকে।

২. বিদ্যুৎ, গ্যাস ও শিল্প ব্যবহারের পানি সরবরাহ যেন নির্দিষ্ট সময়ের আগে বা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মুহূর্তেই কার্যকর থাকে। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে কোনো বড় বিশ্বপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ধরে রাখবে না।

৩. বিদেশি প্রতিনিধি, প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা প্রদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প পরিবেশে যে কোনো ধরনের তোলাবাজি, জবরদখল বা অস্থিতিশীলতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

৪. আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে গিয়ে যেন দেশীয় উদ্যোক্তারা চরম বৈষম্যের শিকার না হন বা সস্তা পণ্যের মাধ্যমে দেশীয় বাজার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে শুল্কনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারাভিত্তিক ‘বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’ কেবল ৮০০ একর জমির একটি ভূখণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্প বিপ্লব এবং বিশ্ব বাণিজ্য অঙ্গনে নিজেদের অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরার এক মূল চাবিকাঠি। দীর্ঘ দশ বছরের অপেক্ষার পর যে নতুন যাত্রার সূচনা হলো, তাতে সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত অংশীদারিত্ব প্রয়োজন।

২০৩১ সালের মধ্যে নির্ধারিত সময়সীমার ভেতর যদি আন্তর্জাতিক মানের সিইটিপি, জেটি, সড়ক ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগের কাজ নিবিড় তদারকির মাধ্যমে শেষ করা যায়, তবে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই আনবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে একটি অন্যতম প্রধান ‘শিল্প, লজিস্টিক ও বাণিজ্যিক হাব’ হিসেবে অধিষ্ঠিত করবে। চীনা বিনিয়োগের এই নতুন অধ্যায় যেন বাংলাদেশের কোটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের শক্ত ভিত্তি হয়ে ওঠে—এটাই প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা।

এমএইচ

জনপ্রিয়

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে বড় বাধা মার্কিন অস্ত্রের ঘাটতি

চীনা বিনিয়োগের নতুন অধ্যায়: কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা

প্রকাশিত : ০৯:০০:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ এবং ভূ-রাজনীতির কৌশলগত মোড়ে দাঁড়িয়ে কোনো দেশের জন্য অর্থনৈতিক সচলতা ধরে রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মাঝে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থব্যবস্থা ও টেকসই শিল্পায়নে এক ইতিবাচক আশার আলো নিয়ে হাজির হয়েছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক আঞ্চলিক সংযোগ ও বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ। সম্প্রতি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় এক দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা হলো বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন)-এর নির্মাণকাজ। প্রায় ৭৮৩ থেকে ৮০০ একর জমিতে গড়ে উঠতে যাওয়া এই বিশেষায়িত জি-টু-জি (গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্ট) শিল্পাঞ্চল শুধু চট্টগ্রাম নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এক দশকে বহু আইনি জটিলতা, ডেভেলপার-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা অতিক্রম করার পর, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাবেই অবকাঠামোগত অগ্রগতি আলোর মুখ দেখেছে।

২০৩১ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার কথা। প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা এবং ১ লাখ মানুষের সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গঠিত এই ইকোনমিক জোনটি আসলে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তা বিশদ পর্যালোচনার দাবি রাখে।

কোনো দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো লজিস্টিক সাপোর্ট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা। আনোয়ারায় বাস্তবায়িত হতে যাওয়া চীনা ইকোনমিক জোনটি অবস্থানগত দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক কেন্দ্রগুলোর একটি। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে এর অবস্থান। কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত শিল্পপণ্য সরাসরি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত জাহাজীকরণ ও এয়ার-ফ্রেইটের মাধ্যমে পাঠানোর মতো এমন চমৎকার সুবিধা সত্যিই বিরল।

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল নদীর ওপারে, অর্থাৎ দক্ষিণ চট্টগ্রামে, বিশ্বমানের শিল্পায়ন ও নগরায়ণ সুসংহত করা। কর্ণফুলী টানেলের ঠিক সঙ্গেই এই জোনের অবস্থান হওয়ায় টানেলটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে।

১,২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, ৩৩০ মিটার সেতু, চার লেনের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সড়ক এবং ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার একটি বহুমুখী জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা যুক্ত থাকায় এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করবে।

বহুমুখীকরণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো একক পণ্যের ওপর অতি-নির্ভরতা। রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, যদি এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কেবল পোশাক বা টেক্সটাইলের সাধারণ কারখানা তৈরি হয়, তবে দেশের সার্বিক অর্থনীতি অতিরিক্ত সুফল পাবে না। তবে আশার কথা হলো, সরকার ও বেজার পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে কেমিক্যাল, ওষুধ, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক্স, আইটি এবং রপ্তানিমুখী ভারী শিল্প স্থাপনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

আমাদের দেশের পোশাক কারখানাগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ কাপড়, রঙ, কেমিক্যাল ও অ্যাকসেসরিজ এখনো চীন থেকে আমদানি করতে হয়। এর ফলে দীর্ঘ সময় লাগে এবং সরবরাহ চেইনে বিপুল খরচ বাড়ে। যদি চায়নিজ ইকোনমিক জোনে চীন থেকে সরাসরি টেক্সটাইল কাঁচামাল, আধুনিক কেমিক্যাল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে, তবে এটি আমাদের আরএমজি খাতের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ কমিয়ে দেবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বহু গুণে বেড়ে যাবে।

গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কর্তৃক অনুমোদিত ৪,১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১,৭২২ কোটি টাকা এবং চীন সরকারের পক্ষ থেকে ২,৪৬৭ কোটি টাকার রেয়াতি ঋণ নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রকল্পটির অবকাঠামোগত ভিত্তি আধুনিক রূপরেখায় সাজানো হচ্ছে।

বিশ্ববাজারে ‘সবুজ শিল্পায়ন’ এবং ইএসজি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত না করলে আন্তর্জাতিক বাজার ধরা কঠিন। এই প্রকল্পের জন্য ২৫ এমএলডি ক্ষমতার সিইটিপি এবং কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা একটি বৈশ্বিক মানের ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। তরুণ ও শিক্ষিত বেকার গোষ্ঠী, কারিগরি ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের পাশাপাশি বিশাল এক অদক্ষ জনবলের নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে।

কেবল শিল্পের চাকা ঘুরবে না, আনোয়ারায় একই সঙ্গে উন্নত আবাসিক এলাকা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বিনোদনমূলক পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠবে। কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ে একটি নতুন কমার্শিয়াল ও রেসিডেন্সিয়াল সিটির জন্ম হতে চলেছে, যা রাজধানী ঢাকা কিংবা মূল চট্টগ্রাম শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ অনেকাংশে লাঘব করবে।

বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি অনুসরণ করে আসছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। জি-টু-জি মডেলের আওতায় এই প্রথম বিশেষায়িত একটি শিল্পাঞ্চল চীনের ডেভেলপার ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’ বাস্তবায়ন করছে।

বেইজিং ও ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক রোডশো এবং প্রধানমন্ত্রীর সফর পরবর্তী বৈঠকের সুবাদে ইতোমধ্যে ৩০টিরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিনিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সফলতার ওপর ভিত্তি করে আগামীতে ইউরোপ ও মার্কিন বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে বড় অঙ্কের অর্থ খাটাতে উদ্বুদ্ধ হবে।

এখানে আমি এই কথাও বলতে চাই যে, যেকোনো বিশাল অর্থনৈতিক প্রকল্পের ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু অবকাঠামোগত ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ থাকে। প্রকল্পটির মূল সুবিধা নিশ্চিতে বাংলাদেশকে নিচের বিষয়গুলোর প্রতি শতভাগ কঠোর ও নজরদারিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১. কাস্টমস প্রসেসিং, ট্যাক্স রেয়াত এবং বিভিন্ন লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই ভোগান্তির শিকার হন। বেজাকে সত্যিকার অর্থেই ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো নথি যেন ফাইলবন্দি না হয়ে থাকে।

২. বিদ্যুৎ, গ্যাস ও শিল্প ব্যবহারের পানি সরবরাহ যেন নির্দিষ্ট সময়ের আগে বা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মুহূর্তেই কার্যকর থাকে। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে কোনো বড় বিশ্বপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ধরে রাখবে না।

৩. বিদেশি প্রতিনিধি, প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা প্রদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প পরিবেশে যে কোনো ধরনের তোলাবাজি, জবরদখল বা অস্থিতিশীলতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

৪. আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে গিয়ে যেন দেশীয় উদ্যোক্তারা চরম বৈষম্যের শিকার না হন বা সস্তা পণ্যের মাধ্যমে দেশীয় বাজার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে শুল্কনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারাভিত্তিক ‘বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’ কেবল ৮০০ একর জমির একটি ভূখণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্প বিপ্লব এবং বিশ্ব বাণিজ্য অঙ্গনে নিজেদের অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরার এক মূল চাবিকাঠি। দীর্ঘ দশ বছরের অপেক্ষার পর যে নতুন যাত্রার সূচনা হলো, তাতে সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত অংশীদারিত্ব প্রয়োজন।

২০৩১ সালের মধ্যে নির্ধারিত সময়সীমার ভেতর যদি আন্তর্জাতিক মানের সিইটিপি, জেটি, সড়ক ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগের কাজ নিবিড় তদারকির মাধ্যমে শেষ করা যায়, তবে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই আনবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে একটি অন্যতম প্রধান ‘শিল্প, লজিস্টিক ও বাণিজ্যিক হাব’ হিসেবে অধিষ্ঠিত করবে। চীনা বিনিয়োগের এই নতুন অধ্যায় যেন বাংলাদেশের কোটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের শক্ত ভিত্তি হয়ে ওঠে—এটাই প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা।

এমএইচ