পশ্চিমবঙ্গে জোট নয়; ‘একলা লড়াই’র ডাক রাহুল গান্ধীর

দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যর্থতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বারবার জোট রাজনীতির ধাক্কার পর অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে নতুন কৌশলের পথে হাঁটতে চাইছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র দুটি আসনে জয় পেলেও সেই ফলকেই ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। আর সেই প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত দুই কংগ্রেস বিধায়কের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। বলেছেন, ‘জোটের ভরসা নয়, নিজেদের শক্তিতেই লড়তে হবে’।

রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফরাক্কার নবনির্বাচিত বিধায়ক মোতাব শেখ এবং রানীনগরের বিধায়ক জুলফিকার আলি।

সূত্র জানিয়েছে, তাদের সামনে রাহুল গান্ধী স্পষ্ট করে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সংগঠন পুনর্গঠনের ওপর। তৃণমূল কিংবা বামেদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বদলে এবার ‘একলা চলো’ নীতিতেই এগোতে চাইছে কংগ্রেস।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস কখনও বামেদের সঙ্গে, কখনও বৃহত্তর বিরোধী জোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে লড়লেও সাংগঠনিকভাবে ক্রমশ দুর্বল হয়েছে। ভোটব্যাংকের বড় অংশ সরে গেছে তৃণমূল ও বিজেপির দিকে। ফলে এবার দলীয় নেতৃত্ব বুঝতে পারছে, জোটের রাজনীতিতে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, বৈঠকে রাহুল গান্ধী দুই বিধায়ককে বলেছেন, ‘এই জয় শেষ নয়, বরং শুরু।’

তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সন্ধান করছে। বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ—এই দুইয়ের মাঝখানে নিজেদের গ্রহণযোগ্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায় কংগ্রেস।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বুথস্তর থেকে সংগঠন পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যুব, ছাত্র এবং সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের ওপর জোর দিতে বলেছেন রাহুল। পাশাপাশি দলিত ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাতেও জনসংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

শুধু বিধানসভায় বক্তব্য রাখাই নয়, এলাকায় এলাকায় ঘুরে মানুষের সমস্যা শোনা এবং লাগাতার আন্দোলনের মাধ্যমে জনসংযোগ বাড়াতে দুই বিধায়ককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি, বেকারত্ব, নারী নিরাপত্তা এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের প্রশ্নকে সামনে রেখে আগামী দিনে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেস এখন বুঝতে পারছে যে পশ্চিমবঙ্গে তাদের সবচেয়ে বড় সংকট সংগঠন নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের অভাব। মাত্র দুটি আসনে জয় পেলেও সেই ফলকে ঘিরে দলীয় কর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। বহু বছর পর বিধানসভায় কংগ্রেসের উপস্থিতি ফিরেছে, যা প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। একদিকে বিজেপি ও তৃণমূলের তীব্র মেরুকরণের রাজনীতি, অন্যদিকে বামেদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে কংগ্রেসের সামনে পথ এখনও কঠিন। তবু রাজনৈতিক মহলের মতে, রাহুল গান্ধীর এই বার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস এবার আর অন্য দলের ছায়ায় থাকতে রাজি নয়।

দুই বিধায়ককে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি এবং তৃণমূল-বিজেপিবিরোধী আলাদা রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তোলাই এখন কংগ্রেসের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে।

এমএইচ

জনপ্রিয়

রাশিয়ায় তৈরি ক্যানসারের টিকা প্রথম রোগীর শরীরে কার্যকরভাবে কাজ করছে

পশ্চিমবঙ্গে জোট নয়; ‘একলা লড়াই’র ডাক রাহুল গান্ধীর

প্রকাশিত : ১২:৪৭:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যর্থতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বারবার জোট রাজনীতির ধাক্কার পর অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে নতুন কৌশলের পথে হাঁটতে চাইছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র দুটি আসনে জয় পেলেও সেই ফলকেই ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। আর সেই প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত দুই কংগ্রেস বিধায়কের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। বলেছেন, ‘জোটের ভরসা নয়, নিজেদের শক্তিতেই লড়তে হবে’।

রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফরাক্কার নবনির্বাচিত বিধায়ক মোতাব শেখ এবং রানীনগরের বিধায়ক জুলফিকার আলি।

সূত্র জানিয়েছে, তাদের সামনে রাহুল গান্ধী স্পষ্ট করে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সংগঠন পুনর্গঠনের ওপর। তৃণমূল কিংবা বামেদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বদলে এবার ‘একলা চলো’ নীতিতেই এগোতে চাইছে কংগ্রেস।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস কখনও বামেদের সঙ্গে, কখনও বৃহত্তর বিরোধী জোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে লড়লেও সাংগঠনিকভাবে ক্রমশ দুর্বল হয়েছে। ভোটব্যাংকের বড় অংশ সরে গেছে তৃণমূল ও বিজেপির দিকে। ফলে এবার দলীয় নেতৃত্ব বুঝতে পারছে, জোটের রাজনীতিতে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, বৈঠকে রাহুল গান্ধী দুই বিধায়ককে বলেছেন, ‘এই জয় শেষ নয়, বরং শুরু।’

তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সন্ধান করছে। বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ—এই দুইয়ের মাঝখানে নিজেদের গ্রহণযোগ্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায় কংগ্রেস।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বুথস্তর থেকে সংগঠন পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যুব, ছাত্র এবং সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের ওপর জোর দিতে বলেছেন রাহুল। পাশাপাশি দলিত ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাতেও জনসংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

শুধু বিধানসভায় বক্তব্য রাখাই নয়, এলাকায় এলাকায় ঘুরে মানুষের সমস্যা শোনা এবং লাগাতার আন্দোলনের মাধ্যমে জনসংযোগ বাড়াতে দুই বিধায়ককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি, বেকারত্ব, নারী নিরাপত্তা এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের প্রশ্নকে সামনে রেখে আগামী দিনে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেস এখন বুঝতে পারছে যে পশ্চিমবঙ্গে তাদের সবচেয়ে বড় সংকট সংগঠন নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের অভাব। মাত্র দুটি আসনে জয় পেলেও সেই ফলকে ঘিরে দলীয় কর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। বহু বছর পর বিধানসভায় কংগ্রেসের উপস্থিতি ফিরেছে, যা প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। একদিকে বিজেপি ও তৃণমূলের তীব্র মেরুকরণের রাজনীতি, অন্যদিকে বামেদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে কংগ্রেসের সামনে পথ এখনও কঠিন। তবু রাজনৈতিক মহলের মতে, রাহুল গান্ধীর এই বার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস এবার আর অন্য দলের ছায়ায় থাকতে রাজি নয়।

দুই বিধায়ককে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি এবং তৃণমূল-বিজেপিবিরোধী আলাদা রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তোলাই এখন কংগ্রেসের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে।

এমএইচ