স্বর্ণের দাম কে ঠিক করে, কিভাবে নির্ধারিত হয়?

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের কোনো একক নিয়ন্ত্রক নেই। কোনো সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা নির্দিষ্ট এক্সচেঞ্জ ঠিক করে দেয় না—এক আউন্স স্বর্ণের দাম কত হবে। বরং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিনিয়ত ক্রেতা–বিক্রেতার লেনদেনের মধ্য দিয়েই স্বর্ণের মূল্য নির্ধারিত হয়। ফিউচার্স বাজার, স্পট মার্কেট এবং ভৌত স্বর্ণ বেচাকেনার কেন্দ্রগুলোতে প্রতিবছর ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেনের মাধ্যমে এই দাম গড়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ একদিকে পণ্য, অন্যদিকে আর্থিক সম্পদ। এটি তামার মতো খনন করা হয়, মুদ্রার মতো সংরক্ষণ করা হয়, তেলের মতো লেনদেন হয় এবং বীমার মতো ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই দ্বৈত চরিত্রের কারণেই স্বর্ণের দাম শুধু চাহিদা–জোগানের ওপর নয় বরং সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি, ভূরাজনীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির ওপরও নির্ভর করে। কাগুজে সম্পদের প্রতি আস্থা কমলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকেই ঝোঁকেন।

লন্ডন থেকে বৈশ্বিক মানদণ্ড

বিশ্বে স্বর্ণের দামের প্রধান মানদণ্ড নির্ধারিত হয় লন্ডনে। লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলবিএমএ) দিনে দুবার ইলেকট্রনিক নিলাম পদ্ধতিতে ‘এলবিএমএ গোল্ড প্রাইস’ নির্ধারণ করে। এতে জেপি মরগ্যান চেজ, গোল্ডম্যান স্যাকস ও ইউবিএসসহ ১৫টি বড় ব্যাংক অংশ নেয়। ক্রেতা–বিক্রেতার ভারসাম্য ১০ হাজার আউন্সের বেশি হলে দাম সমন্বয় করে আবার নিলাম শুরু হয়—এভাবেই চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত হয়।

এই দামই খনি কোম্পানি ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় টাকশাল স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণে ব্যবহার করে। লন্ডনের বাজার মূলত ‘হোলসেল’ বা পাইকারি দামের প্রতিফলন—যেখানে দৈনন্দিন জল্পনার প্রভাব তুলনামূলক কম।

নিউইয়র্কে স্পট দামের জন্ম

ভৌত স্বর্ণের লেনদেন লন্ডনে হলেও তাৎক্ষণিক বা ‘স্পট প্রাইস’ মূলত নির্ধারিত হয় নিউইয়র্কের কমেক্স ফিউচার্স বাজারে। এখানে বিপুল পরিমাণ ‘পেপার গোল্ড’ লেনদেন হয়, যার পরিমাণ বাস্তব স্বর্ণের সরবরাহের তুলনায় বহু গুণ বেশি।

মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্য, সুদের হার ও ডলারের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে এখানে স্বর্ণের দাম দ্রুত বদলে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ভূমিকা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণের বাজারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবক হলো বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের মালিক হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ কিনছে। এসব কেনাকাটা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি, ফলে বাজারে স্বর্ণের মুক্ত সরবরাহ কমে যায় এবং দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়।

সুদের হার, ডলার ও ভূরাজনীতি

স্বর্ণের দামের সঙ্গে প্রকৃত সুদের হারের সম্পর্ক নেতিবাচক। সুদের হার কম বা মুদ্রাস্ফীতি বেশি হলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে। আবার ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণ বিদেশি ক্রেতাদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ডলার ও স্বর্ণ—দুটোর দামই একসঙ্গে বাড়ার নজির দেখা যাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের ভূমিকা

ইতিহাস বলছে, স্বর্ণের দাম কখনো দীর্ঘ সময় স্থির থাকে, আবার সংকটকালে হঠাৎ বড় উত্থান ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ স্বল্পমেয়াদি মুনাফার হাতিয়ার নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পদ। আর্থিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও ঋণের চাপ বাড়লে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকেই ফিরে তাকান।

সব মিলিয়ে, স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করে কোনো একক শক্তি নয়—বরং প্রতিদিনের বৈশ্বিক লেনদেন, বিনিয়োগকারীর আস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত এবং বিশ্বরাজনীতির অনিশ্চয়তার সম্মিলিত ফলই ঠিক করে দেয় স্বর্ণের প্রকৃত মূল্য।

এমএইচ

জনপ্রিয়

স্বর্ণের দাম কে ঠিক করে, কিভাবে নির্ধারিত হয়?

প্রকাশিত : ১০:৩০:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের কোনো একক নিয়ন্ত্রক নেই। কোনো সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা নির্দিষ্ট এক্সচেঞ্জ ঠিক করে দেয় না—এক আউন্স স্বর্ণের দাম কত হবে। বরং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিনিয়ত ক্রেতা–বিক্রেতার লেনদেনের মধ্য দিয়েই স্বর্ণের মূল্য নির্ধারিত হয়। ফিউচার্স বাজার, স্পট মার্কেট এবং ভৌত স্বর্ণ বেচাকেনার কেন্দ্রগুলোতে প্রতিবছর ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেনের মাধ্যমে এই দাম গড়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ একদিকে পণ্য, অন্যদিকে আর্থিক সম্পদ। এটি তামার মতো খনন করা হয়, মুদ্রার মতো সংরক্ষণ করা হয়, তেলের মতো লেনদেন হয় এবং বীমার মতো ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই দ্বৈত চরিত্রের কারণেই স্বর্ণের দাম শুধু চাহিদা–জোগানের ওপর নয় বরং সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি, ভূরাজনীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির ওপরও নির্ভর করে। কাগুজে সম্পদের প্রতি আস্থা কমলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকেই ঝোঁকেন।

লন্ডন থেকে বৈশ্বিক মানদণ্ড

বিশ্বে স্বর্ণের দামের প্রধান মানদণ্ড নির্ধারিত হয় লন্ডনে। লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলবিএমএ) দিনে দুবার ইলেকট্রনিক নিলাম পদ্ধতিতে ‘এলবিএমএ গোল্ড প্রাইস’ নির্ধারণ করে। এতে জেপি মরগ্যান চেজ, গোল্ডম্যান স্যাকস ও ইউবিএসসহ ১৫টি বড় ব্যাংক অংশ নেয়। ক্রেতা–বিক্রেতার ভারসাম্য ১০ হাজার আউন্সের বেশি হলে দাম সমন্বয় করে আবার নিলাম শুরু হয়—এভাবেই চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত হয়।

এই দামই খনি কোম্পানি ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় টাকশাল স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণে ব্যবহার করে। লন্ডনের বাজার মূলত ‘হোলসেল’ বা পাইকারি দামের প্রতিফলন—যেখানে দৈনন্দিন জল্পনার প্রভাব তুলনামূলক কম।

নিউইয়র্কে স্পট দামের জন্ম

ভৌত স্বর্ণের লেনদেন লন্ডনে হলেও তাৎক্ষণিক বা ‘স্পট প্রাইস’ মূলত নির্ধারিত হয় নিউইয়র্কের কমেক্স ফিউচার্স বাজারে। এখানে বিপুল পরিমাণ ‘পেপার গোল্ড’ লেনদেন হয়, যার পরিমাণ বাস্তব স্বর্ণের সরবরাহের তুলনায় বহু গুণ বেশি।

মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্য, সুদের হার ও ডলারের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে এখানে স্বর্ণের দাম দ্রুত বদলে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ভূমিকা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণের বাজারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবক হলো বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের মালিক হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ কিনছে। এসব কেনাকাটা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি, ফলে বাজারে স্বর্ণের মুক্ত সরবরাহ কমে যায় এবং দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়।

সুদের হার, ডলার ও ভূরাজনীতি

স্বর্ণের দামের সঙ্গে প্রকৃত সুদের হারের সম্পর্ক নেতিবাচক। সুদের হার কম বা মুদ্রাস্ফীতি বেশি হলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে। আবার ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণ বিদেশি ক্রেতাদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ডলার ও স্বর্ণ—দুটোর দামই একসঙ্গে বাড়ার নজির দেখা যাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের ভূমিকা

ইতিহাস বলছে, স্বর্ণের দাম কখনো দীর্ঘ সময় স্থির থাকে, আবার সংকটকালে হঠাৎ বড় উত্থান ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ স্বল্পমেয়াদি মুনাফার হাতিয়ার নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পদ। আর্থিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও ঋণের চাপ বাড়লে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকেই ফিরে তাকান।

সব মিলিয়ে, স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করে কোনো একক শক্তি নয়—বরং প্রতিদিনের বৈশ্বিক লেনদেন, বিনিয়োগকারীর আস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত এবং বিশ্বরাজনীতির অনিশ্চয়তার সম্মিলিত ফলই ঠিক করে দেয় স্বর্ণের প্রকৃত মূল্য।

এমএইচ