নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র মামদানি

 

বিশ্বের বাণিজ্যিক রাজধানী নিউইয়র্ক সিটির ৪০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তরুন ইমিগ্রান্ট জোহরান মামদানি। ৩৩ বছর বয়সী জোহরান মামদানি একজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট। মামদানির ঐতিহাসিক এই বিজয় যেমন আনন্দে ভাসছে প্রগতিশীল শিবির, তেমনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রিপাবলিকানরা এবং কিছু ডেমোক্রেটিক মধ্যপন্থী নেতাও।
মামদানি নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম মেয়রের দায়িত্ব নেবেন। মামদানি হবেন প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মেয়র। শুধু তাই নয় এক শতাব্দীর মধ্যে মামদানি হবেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ মেয়র।

৪ নভেম্বরের মেয়র নির্বাচনে ফলাফলে দেখা যায়, নিউইয়র্ক সিটির ৫ বরোতে জোহরান মামদানি পেয়েছেন ১০ লাখ ৩৬ হাজার ৫১ ভোট, যা মোট ভোটের ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু ক্যুমো পেয়েছেন ৮ লাখ ৫৪ হাজার ৯৯৫ ভোট। রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়া পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৩৭ ভোট। গত ৩০ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি।

নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণে মামদানি বলেছেন, নিউইয়র্কের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে, সামথ্যের মধ্যে থাকা একটি শহরের পক্ষে রায় দিয়েছে। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বন্ধুরা, আমরা একটি রাজনৈতিক রাজবংশকে উৎখাত করেছি। নিউইয়র্ক শহরের নতুন জন্ম হয়েছে।’

নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী কার্টিস স্লিওয়া এরই মধ্যে মামদানিকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে সমর্থকদের একটি দলকে স্লিওয়া বলেন, ‘আমাদের একজন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। অবশ্যই আমি তাকে শুভকামনা জানাই, কারণ তিনি যদি ভালো করেন, তাহলে আমরাও ভালো করব।’

প্রায় এক বছর আগে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করা জোহরান মামদানির জন্য এটি এক অবিস্মরণীয় উত্থান। স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান থেকে আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরের নেতৃত্বে পৌঁছে গেলেন তিনি। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে তিনি নিউইয়র্কের প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরীকে দুই-দুইবার হারিয়ে দেন।

এখন জাতীয়ভাবে পরিচিত এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জোহরান মামদানিকে সামলাতে হবে বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো, বাস্তবায়ন করতে হবে তার উচ্চাভিলাষী নীতিমালা এবং প্রগতিশীল রাজনীতির জাতীয় ধারায় প্রভাব বিস্তার করতে হবে। তার ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ভাড়া নিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটে ভাড়া বৃদ্ধিতে স্থগিতাদেশ, সার্বজনীন শিশুসেবা, বিনামূল্যে বাস চলাচল ব্যবস্থা ও সিটি করপোরেশন পরিচালিত মুদি দোকান চালু করা।

মামদানির এই জয়ের প্রভাব শুধু নিউইয়র্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা সারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিউইয়র্কে এখন তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে অ্যালবানি ও সিটি কাউন্সিলের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করা, যাদের অনেকেই শুরুতে তার পাশে দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন।

সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মামদানি নিউইয়র্কের প্রায় সব জাতিগত গোষ্ঠীর ভোট পেয়েছেন, শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো, এশীয় ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভোটারদের বড় অংশই তাকে বেছে নিয়েছেন। ৪৫ বছরের নিচের ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল; ক্যুমোর চেয়ে ৪৩ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন তিনি। অন্যদিকে ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে ভোটারদের মধ্যে ক্যুমো ১০ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।

মামদানির ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নির্বাচনজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তার মুসলিম পরিচয় ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়ে বিরূপ প্রচারণা চললেও শেষ পর্যন্ত ভোটাররা তাকেই সমর্থন দেন। ইহুদি ভোটারদের মধ্যে ক্যুমো এগিয়ে ছিলেন ৬০% ভোটে, যেখানে মামদানি পান ৩১% ভোট।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

১৭ বছরের আন্দোলনেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি: রিজভী

নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র মামদানি

প্রকাশিত : ০৭:৩৩:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫

 

বিশ্বের বাণিজ্যিক রাজধানী নিউইয়র্ক সিটির ৪০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তরুন ইমিগ্রান্ট জোহরান মামদানি। ৩৩ বছর বয়সী জোহরান মামদানি একজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট। মামদানির ঐতিহাসিক এই বিজয় যেমন আনন্দে ভাসছে প্রগতিশীল শিবির, তেমনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রিপাবলিকানরা এবং কিছু ডেমোক্রেটিক মধ্যপন্থী নেতাও।
মামদানি নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম মেয়রের দায়িত্ব নেবেন। মামদানি হবেন প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মেয়র। শুধু তাই নয় এক শতাব্দীর মধ্যে মামদানি হবেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ মেয়র।

৪ নভেম্বরের মেয়র নির্বাচনে ফলাফলে দেখা যায়, নিউইয়র্ক সিটির ৫ বরোতে জোহরান মামদানি পেয়েছেন ১০ লাখ ৩৬ হাজার ৫১ ভোট, যা মোট ভোটের ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু ক্যুমো পেয়েছেন ৮ লাখ ৫৪ হাজার ৯৯৫ ভোট। রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়া পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৩৭ ভোট। গত ৩০ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি।

নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণে মামদানি বলেছেন, নিউইয়র্কের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে, সামথ্যের মধ্যে থাকা একটি শহরের পক্ষে রায় দিয়েছে। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বন্ধুরা, আমরা একটি রাজনৈতিক রাজবংশকে উৎখাত করেছি। নিউইয়র্ক শহরের নতুন জন্ম হয়েছে।’

নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী কার্টিস স্লিওয়া এরই মধ্যে মামদানিকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে সমর্থকদের একটি দলকে স্লিওয়া বলেন, ‘আমাদের একজন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। অবশ্যই আমি তাকে শুভকামনা জানাই, কারণ তিনি যদি ভালো করেন, তাহলে আমরাও ভালো করব।’

প্রায় এক বছর আগে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করা জোহরান মামদানির জন্য এটি এক অবিস্মরণীয় উত্থান। স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান থেকে আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরের নেতৃত্বে পৌঁছে গেলেন তিনি। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে তিনি নিউইয়র্কের প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরীকে দুই-দুইবার হারিয়ে দেন।

এখন জাতীয়ভাবে পরিচিত এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জোহরান মামদানিকে সামলাতে হবে বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো, বাস্তবায়ন করতে হবে তার উচ্চাভিলাষী নীতিমালা এবং প্রগতিশীল রাজনীতির জাতীয় ধারায় প্রভাব বিস্তার করতে হবে। তার ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ভাড়া নিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটে ভাড়া বৃদ্ধিতে স্থগিতাদেশ, সার্বজনীন শিশুসেবা, বিনামূল্যে বাস চলাচল ব্যবস্থা ও সিটি করপোরেশন পরিচালিত মুদি দোকান চালু করা।

মামদানির এই জয়ের প্রভাব শুধু নিউইয়র্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা সারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিউইয়র্কে এখন তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে অ্যালবানি ও সিটি কাউন্সিলের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করা, যাদের অনেকেই শুরুতে তার পাশে দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন।

সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মামদানি নিউইয়র্কের প্রায় সব জাতিগত গোষ্ঠীর ভোট পেয়েছেন, শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো, এশীয় ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভোটারদের বড় অংশই তাকে বেছে নিয়েছেন। ৪৫ বছরের নিচের ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল; ক্যুমোর চেয়ে ৪৩ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন তিনি। অন্যদিকে ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে ভোটারদের মধ্যে ক্যুমো ১০ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।

মামদানির ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নির্বাচনজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তার মুসলিম পরিচয় ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়ে বিরূপ প্রচারণা চললেও শেষ পর্যন্ত ভোটাররা তাকেই সমর্থন দেন। ইহুদি ভোটারদের মধ্যে ক্যুমো এগিয়ে ছিলেন ৬০% ভোটে, যেখানে মামদানি পান ৩১% ভোট।