জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে প্রদর্শিত ডকুমেন্টারিতে শহীদ আবু সাঈদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ছবি না থাকায় সমালোচনা করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তিনি বলেছেন, “যে ডকুমেন্টারিতে আবু সাঈদের ছবি নেই, খালেদা জিয়ার ছবিও নেই, সেটি কোনো ডকুমেন্টারি হতে পারে না।”
বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলানগরের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত ডকুমেন্টারিতে অনেক ভুল ছিল। তিনি বলেন, “প্রথম ভুল আমি দেখেছি, সেখানে তো আবু সাঈদের ছবিই নেই। আবু সাঈদ এই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি, প্রতীক। তার ছবি না থাকলে এর কোনো ডকুমেন্টারি হলো না। সেখানে আরও নেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও। সেটাও কোনো ডকুমেন্টারি হতে পারে না।”
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ভুল স্বীকার করে বারবার ক্ষমা চেয়েছেন। এরপরও জাতীয় অনুষ্ঠানে হট্টগোল চলতে থাকা কাম্য ছিল না। “এ ধরনের একটি জাতীয় অনুষ্ঠানকে সংসদের ওয়াকআউটের মতো পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।”
রাষ্ট্রপতি জানান, তিনি লক্ষ্য করেছেন সংসদ সদস্য আক্তার তার অনুসারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে অনুসারীরা অনেক সময় নেতার কথা না শুনে নিজেদের বড় প্রমাণ করতে চান বলেই পরিস্থিতির এমন অবনতি হয়েছে।
তিনি বলেন, “আজকের এই অনুষ্ঠানটি যেভাবে শেষ হলো, তা একেবারেই অভিপ্রেত ছিল না। জাতীয় অনুষ্ঠানে আমরা জাতীয় ঐক্যের কোনো বহিঃপ্রকাশ দেখাতে পারলাম না। ভুল তো মানুষ করেই। সেই ভুল সবাই মিলে শুধরে নেওয়া উচিত।”
বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে এমন পরিস্থিতি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম বিদেশিরা যেহেতু আছেন, ইংরেজিতে ভাষণ দেব। তারা দেখুক, ১৬ বছর আমরা কীভাবে কাটিয়েছি। কিন্তু তারা তো এরই মধ্যে চলে গেছেন। বিদেশি অতিথিদের সামনে এভাবে নাস্তানাবুদ হওয়া আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে। এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি খুশি হবে, যিনি পাশের দেশে বসে আছেন।”
তিনি বলেন, “আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। হাওয়ার ওপর ভেসে এসে এখানে বসিনি। এই সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। তাই সরকারকে প্রয়োজনীয় শ্রদ্ধা ও সম্মান দেওয়া উচিত। আমরা ভুল করলে সেই ভুলের মাসুল দেব, কিন্তু সবাই মিলে ভুল সংশোধন করতে চাই।”
সকালের অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি বলেন, “সকালের অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত চমৎকার। প্রফেসর ইউনূস নিচে বসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে ডেকে পাশে বসিয়েছেন, স্টেজে তুলে সম্মান দেখিয়েছেন। এটাই তো আমরা দেখতে চাই। সবাইকে সম্মান করতে চাই, কাউকে অপমান করতে চাই না।”
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্যের সময় ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেওয়া কি মানায়? কবে আমরা এসব শিখব?”
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি আহত জুলাই যোদ্ধাদের কথা তুলে ধরে বলেন, “একজন মা তার অন্ধ ছেলেকে নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলেটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চোখ হারিয়েছে। তারা যদি আজও মর্যাদা না পায়, যদি ছোটখাটো প্রয়োজনে মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তাহলে সেটি জাতির জন্য লজ্জার।”
তিনি উপস্থিত দুই মন্ত্রীর প্রশংসা করে বলেন, “জুনায়েদ সাকিব চমৎকার বক্তব্য দিয়েছেন। এই সরকার আপনাদের নির্বাচিত সরকার। আমরা ভুল করলে আমাদের শুধরে দেবেন। আমরা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ হতে পারব না, হতেও চাই না।”
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “এত অন্যায়, অবিচার, খুন, গুম, মানি লন্ডারিং, নির্যাতন, আয়নাঘরের মতো ঘটনা ঘটানোর পরও তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। আবার তারা বলে, ডিসেম্বর মাসে দেশে আসবে। আসুক দেশে, রাজপথে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।”
নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন ৮২ বছর বয়সে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি যুদ্ধও করব। বাংলাদেশের জনগণের শাসন ও গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করে যাব। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে আহত হয়েছিলাম, এই ধরনের বাংলাদেশ দেখার জন্য নয়।”
তিনি বলেন, “জুলাইয়ের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। পৃথিবীতে এমন সাহসী জাতি খুব কম আছে, যারা সঙ্গিনের সামনে আবু সাঈদের মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে। আমরা সেই জাতি, এ নিয়ে আমরা গর্ব করি।”
জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, “মন খারাপ করবেন না। ১৯৭১ সালের শহীদরাও অনেক কিছু পাননি। আপনারাও হয়তো সবকিছু পাবেন না। কিন্তু এই সরকারের কাছ থেকে সম্মান অবশ্যই পাবেন।”
তিনি বলেন, “গরিব দেশ হিসেবে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে, সবটুকু দিয়েই জুলাইয়ে আত্মাহুতি দেওয়া পরিবারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এই সরকারের সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে।”
তিনি বলেন, “মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। কোনো বিভাজন বা বিদ্বেষ যেন এই যাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে।”
রাষ্ট্রপতি সরকার সমর্থকদের ধৈর্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আপনারা পাল্টা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি, এজন্য ধন্যবাদ।”
গণতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। একইভাবে জুলাইয়ের এই যুদ্ধও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। নির্বাচন গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশে যতদিন গণতন্ত্র থাকবে, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, ততদিনই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে।”
শেষদিকে রাষ্ট্রপতি বলেন, “রাষ্ট্রপতি হিসেবে সব কথা বলা ঠিক নয়। আমি এমন কোনো কথা বলতে চাই না, যাতে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়। আমি সামান্য একজন মানুষ। জনগণ, দল এবং জাতীয় সংসদ আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। এই চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করা শুধু আমার নয়, বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রতিটি নাগরিককে সচেতন থাকতে হবে।”
বক্তব্যের শেষে তিনি মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে ঐক্য, দেশপ্রেম, সততা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এমএইচ
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















