অরুণাচল নিয়ে দিল্লির অস্বস্তি, চীনের গতিবিধিতে নতুন শঙ্কা

অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে ভারত ও চীনের পুরোনো সীমান্ত বিরোধ নতুন করে উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অরুণাচলের ২৭টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের নতুন নামকরণ করে নয়াদিল্লি বেইজিংকে কড়া বার্তা দেওয়ার পরই ওই অঞ্চলে চীনা গতিবিধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস।

পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে ২০২০ সালের গলওয়ান সংঘর্ষের স্মৃতিও।কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, অরুণাচল নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে আগামী মাসে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে সেই সফর নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে চীন। ভারত অবশ্য সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। নয়াদিল্লির অবস্থান, অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধের অন্যতম কেন্দ্র এই রাজ্য।সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের নামকরণ করেছে ভারত।

নয়াদিল্লির বক্তব্য, এই নামকরণ অরুণাচলের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করার একটি পদক্ষেপ। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে ভারতের মানচিত্রে ওই স্থানগুলিকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নতুন করে চিহ্নিত ২৭টি স্থানের মধ্যে রয়েছে ২১টি বসতিপূর্ণ এলাকা, চারটি গিরিপথ, একটি হ্রদ এবং একটি স্মৃতিস্তম্ভ। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে লংজু, মাজা ও বিসা। এগুলির অবস্থান সুবনসিরি এলাকার উত্তরে। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চল ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধের অন্যতম স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে পরিচিত।বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে লংজুকে ঘিরে। ১৯৫৯ সাল থেকে ওই এলাকা চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তবে নয়াদিল্লির দাবি, লংজু ভারতীয় ভূখণ্ডের অন্তর্গত। ফলে ভারতের নতুন নামকরণকে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাদের মতে, অরুণাচলের বিতর্কিত এলাকাগুলির উপরে ভারতের দাবি আরও জোরালো করতেই এই পদক্ষেপ।এই পরিস্থিতির মধ্যেই চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে কংগ্রেস। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী অরুণাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর শুক্রবার একই প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে।

খড়গে অভিযোগ করেছেন, গলওয়ানের ঘটনার পরে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে নতুন করে অস্বস্তিকর খবর সামনে আসছে। তার প্রশ্ন, ভারতের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় টহল দেওয়ার অধিকার কি কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালে সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে ভারতের টহলদারি কমে যাওয়ার কারণ নিয়েও তিনি সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন।

কংগ্রেস সভাপতির বক্তব্যে উঠে এসেছে ২০২০ সালের গলওয়ান সংঘর্ষের প্রসঙ্গ। ওই বছরের মে মাস থেকে পূর্ব লাদাখে ভারত ও চিনের সেনাদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। জুন মাসে গলওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষে ভারতীয় সেনার ২০ জন সদস্য নিহত হন। সেই ঘটনার পর দুই দেশের সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব পড়ে।পরবর্তী সময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিক দফায় আলোচনা হলেও সীমান্ত সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

সীমান্তে সেনা মোতায়েন, টহলদারি এবং নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখনও পুরোপুরি কাটেনি।এই পরিস্থিতিতে অরুণাচলের ২৭টি স্থানকে নতুন নামে চিহ্নিত করার ঘটনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দিল্লির কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট, অরুণাচল নিয়ে চীনের দাবিকে কোনোভাবেই মেনে নেবে না ভারত। একই সঙ্গে বেজিংয়ের সামরিক ও কৌশলগত তৎপরতার ওপরও নজর রাখছে নয়াদিল্লি।

তবে কূটনৈতিক মহলের মতে, সীমান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পাল্টা নামকরণের পাশাপাশি আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা রাখাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অরুণাচল নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাণিজ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আগামী মাসের ব্রিকস বৈঠক। সেখানে শি জিনপিংয়ের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। সীমান্ত নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে ভারত ও চিনের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের পরিবেশ কতটা স্বাভাবিক থাকে, এখন সেদিকেই নজর রাখছে নয়াদিল্লি।

গলওয়ানের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। সেই প্রেক্ষাপটে অরুণাচল নিয়ে নতুন করে ওঠা প্রশ্ন ভারত ও চীনের সম্পর্ককে ফের কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ।

এমএইচ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

তেলের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় সৌদি, বিশ্বের জন্য বড় বিপদের ঝুঁকি

অরুণাচল নিয়ে দিল্লির অস্বস্তি, চীনের গতিবিধিতে নতুন শঙ্কা

প্রকাশিত : ০৫:২৭:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে ভারত ও চীনের পুরোনো সীমান্ত বিরোধ নতুন করে উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অরুণাচলের ২৭টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের নতুন নামকরণ করে নয়াদিল্লি বেইজিংকে কড়া বার্তা দেওয়ার পরই ওই অঞ্চলে চীনা গতিবিধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস।

পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে ২০২০ সালের গলওয়ান সংঘর্ষের স্মৃতিও।কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, অরুণাচল নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে আগামী মাসে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে সেই সফর নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে চীন। ভারত অবশ্য সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। নয়াদিল্লির অবস্থান, অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধের অন্যতম কেন্দ্র এই রাজ্য।সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের নামকরণ করেছে ভারত।

নয়াদিল্লির বক্তব্য, এই নামকরণ অরুণাচলের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করার একটি পদক্ষেপ। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে ভারতের মানচিত্রে ওই স্থানগুলিকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নতুন করে চিহ্নিত ২৭টি স্থানের মধ্যে রয়েছে ২১টি বসতিপূর্ণ এলাকা, চারটি গিরিপথ, একটি হ্রদ এবং একটি স্মৃতিস্তম্ভ। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে লংজু, মাজা ও বিসা। এগুলির অবস্থান সুবনসিরি এলাকার উত্তরে। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চল ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধের অন্যতম স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে পরিচিত।বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে লংজুকে ঘিরে। ১৯৫৯ সাল থেকে ওই এলাকা চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তবে নয়াদিল্লির দাবি, লংজু ভারতীয় ভূখণ্ডের অন্তর্গত। ফলে ভারতের নতুন নামকরণকে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাদের মতে, অরুণাচলের বিতর্কিত এলাকাগুলির উপরে ভারতের দাবি আরও জোরালো করতেই এই পদক্ষেপ।এই পরিস্থিতির মধ্যেই চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে কংগ্রেস। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী অরুণাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর শুক্রবার একই প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে।

খড়গে অভিযোগ করেছেন, গলওয়ানের ঘটনার পরে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে নতুন করে অস্বস্তিকর খবর সামনে আসছে। তার প্রশ্ন, ভারতের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় টহল দেওয়ার অধিকার কি কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালে সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে ভারতের টহলদারি কমে যাওয়ার কারণ নিয়েও তিনি সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন।

কংগ্রেস সভাপতির বক্তব্যে উঠে এসেছে ২০২০ সালের গলওয়ান সংঘর্ষের প্রসঙ্গ। ওই বছরের মে মাস থেকে পূর্ব লাদাখে ভারত ও চিনের সেনাদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। জুন মাসে গলওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষে ভারতীয় সেনার ২০ জন সদস্য নিহত হন। সেই ঘটনার পর দুই দেশের সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব পড়ে।পরবর্তী সময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিক দফায় আলোচনা হলেও সীমান্ত সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

সীমান্তে সেনা মোতায়েন, টহলদারি এবং নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখনও পুরোপুরি কাটেনি।এই পরিস্থিতিতে অরুণাচলের ২৭টি স্থানকে নতুন নামে চিহ্নিত করার ঘটনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দিল্লির কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট, অরুণাচল নিয়ে চীনের দাবিকে কোনোভাবেই মেনে নেবে না ভারত। একই সঙ্গে বেজিংয়ের সামরিক ও কৌশলগত তৎপরতার ওপরও নজর রাখছে নয়াদিল্লি।

তবে কূটনৈতিক মহলের মতে, সীমান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পাল্টা নামকরণের পাশাপাশি আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা রাখাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অরুণাচল নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাণিজ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আগামী মাসের ব্রিকস বৈঠক। সেখানে শি জিনপিংয়ের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। সীমান্ত নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে ভারত ও চিনের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের পরিবেশ কতটা স্বাভাবিক থাকে, এখন সেদিকেই নজর রাখছে নয়াদিল্লি।

গলওয়ানের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। সেই প্রেক্ষাপটে অরুণাচল নিয়ে নতুন করে ওঠা প্রশ্ন ভারত ও চীনের সম্পর্ককে ফের কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ।

এমএইচ