যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগা দিয়ে ইরানের ২০০ কোটি ডলারের সামরিক আমদানি

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সামরিক সরঞ্জাম আমদানির জন্য পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থার একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরান। এসব সংস্থার নামের শুরুতে রয়েছে ‘এমওডি’। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারি ট্রাক আমদানি করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত চলাকালে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে ইরান। এসব অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণে দেশটি কীভাবে সক্ষম হচ্ছে, তার একটি চিত্র পাওয়া গেছে এই অনুসন্ধানে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অত্যন্ত সুসংগঠিত এই সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং দেশটির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বুনিয়াদ’ নামে পরিচিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন পণ্যের চালান ও জাহাজ পরিবহণের নথিতে এ নেটওয়ার্কের আর্থিক লেনদেনের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত এসব সংস্থার কোনো একটির বিরুদ্ধেও পশ্চিমা সরকারগুলো নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে—এমন প্রমাণ তারা পায়নি।

যেভাবে কাজ করে গোপন নেটওয়ার্ক

ইসরাইলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ২৪০ অ্যানালিটিকসের সঙ্গে যৌথভাবে করা অনুসন্ধানে রয়টার্স প্রথমবারের মতো এই নেটওয়ার্কের পরিচয় প্রকাশ করেছে। এটি তেহরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নেটওয়ার্কের সংস্থাগুলোর নামের শুরুতে থাকে ‘এমওডি’ অথবা ফারসি ভাষায় ‘ভিওডিজেএ’। এরপর পাঁচ বা ছয় অঙ্কের একটি সংখ্যা কথায় লেখা থাকে। সব সংস্থার ঠিকানা ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তেহরানের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি সংস্থার প্রতিষ্ঠার তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি—যেদিন আয়াতুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

তবে করপোরেট নথিতে দেখা গেছে, এসব সংস্থার অধিকাংশই প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। সে সময় নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ও মুদ্রাব্যবস্থা চাপে পড়েছিল।

তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত পূরণ করতে এসব সংস্থা বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী ও বিদেশি ভুয়া কোম্পানির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। সম্মিলিতভাবে এসব মধ্যস্থতাকারীকে ‘ট্রাস্টি’ বলা হয়।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা চালানের ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রে লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে ‘মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়াই’। ফলে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থের সরাসরি লেনদেন কম হয়েছে, যা নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার নজরে আসার ঝুঁকিও কমায়।

এসব সংস্থার মাধ্যমে আমদানি করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও ভারি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান। এসব পণ্য চীন, রাশিয়া ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

যেভাবে শনাক্ত হলো নেটওয়ার্ক

২৪০ অ্যানালিটিকসের অর্থনীতিবিদ নোয়াম বিনস্টক ২০২৫ সালের জুনে এই নেটওয়ার্কের ধরন শনাক্ত করেন। সে সময় তিনি ব্যাংক সেপাহের ফাঁস হওয়া কিছু নথি বিশ্লেষণ করছিলেন। আইআরজিসির সদস্যদের বেতন-ভাতা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এই ব্যাংকের নথিগুলো টেলিগ্রাম ও উইকিইরান ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে পড়েছিল।

নথিতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ৩৬টি সংস্থার কাছে বৈদেশিক মুদ্রায় ১২০ কোটি ডলার ছিল। অন্য সংস্থাগুলোর কাছে স্থানীয় মুদ্রায় ছিল প্রায় ১৮০ কোটি ডলার।

পরে বিনস্টক জানতে পারেন, এসব সংস্থা তেল বিক্রির অর্থ গ্রহণ করে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম কিনছে। প্রতিটি সংস্থার জন্য রয়েছে ১১ অঙ্কের আলাদা পরিচিতি নম্বর। জাহাজ পরিবহনের নথি, চালান ও ব্যাংক হিসাবেও একই নম্বর ব্যবহৃত হওয়ায় ভুয়া কোম্পানির আড়ালেও নেটওয়ার্কটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

এরপর প্রায় ১৯ হাজার আমদানি নথির একটি অংশ জাহাজ চলাচলের কাগজপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও, স্যাটেলাইট চিত্র ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করে রয়টার্স।

সবচেয়ে বড় ক্রেতা এমওডি ৩৪৬৪২৮

নেটওয়ার্কের সংস্থাগুলোর মধ্যে এমওডি ৩৪৬৪২৮ বিশেষভাবে নজরে এসেছে। ২০২৩ সালের মার্চে শেষ হওয়া এক বছরে সংস্থাটির আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। এতে সংস্থাটি ইরানের শীর্ষ ১০ আমদানিকারকের তালিকায় উঠে আসে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সংস্থাটি ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান, বিস্ফোরক ও অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে সংস্থাটি চীন থেকে ৮৮৬ টন রাসায়নিক আমদানি করে। এর মধ্যে ছিল সোডিয়াম ক্লোরেট ও বিভিন্ন পারক্লোরেট, যা কঠিন জ্বালানিচালিত রকেটের জ্বালানি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। এসব পণ্য বান্দর আব্বাস বন্দর দিয়ে ইরানে প্রবেশ করে।

রয়টার্সের উদ্ধৃত সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল দক্ষিণ ইরানের শহীদ রাজায়ি বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পেছনে এসব চালানের একটি থেকে আসা সোডিয়াম পারক্লোরেটের ভূমিকা ছিল। বন্দরের কনটেইনারে থাকা রাসায়নিকটিতে আগুন ধরে বিস্ফোরণ ঘটে বলে সূত্রগুলোর দাবি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, রাসায়নিকগুলো সংরক্ষণ করেছিল সিনা পোর্ট অ্যান্ড মেরিন সার্ভিসেস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি বুনিয়াদ মোস্তাজাফানের মালিকানাধীন। বহু বিলিয়ন ডলারের এই ফাউন্ডেশন সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ওই বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন।

ট্রাক ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান আমদানি

এমওডি ৩৪৬৪২৮ মোট ৪৩৫টি ইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে। সামরিক বাহিনী এ ধরনের ট্রাককে ছদ্মবেশী চলমান ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহার করে।

এর আগে ২০২২ সালে একই ধরনের ছয়টি ট্রাক কেনা হয়েছিল। পরে সেগুলো সাহারা থান্ডার নামের একটি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছায়। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের অভিযোগে ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এ ছাড়া সংস্থাটি হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার পিকআপ আমদানি করেছে। আইআরজিসি এসব গাড়িতে ভারি মেশিনগান সংযুক্ত করে ব্যবহার করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইভেকো জানিয়েছে, ইরানে তাদের কোনো গাড়ি ব্যবহৃত হয়ে থাকলে তা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অন্যদিকে টয়োটা বলেছে, তারা ইরানে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করে না।

যুদ্ধের মধ্যেও অব্যাহত আমদানি

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও ইরানে সামরিক সরঞ্জাম ও কাঁচামাল সরবরাহ অব্যাহত ছিল বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

যুদ্ধ শুরুর আগের কয়েক সপ্তাহে ইরান চীন থেকে ৯৩ টন টাইটানিয়াম আমদানি করে। উচ্চ শক্তিসম্পন্ন এই ধাতু ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো ও রকেটের মোটরের আবরণ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে অস্ত্র ও নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া চীন থেকে ২৬৮ টন নাইট্রোসেলুলোজ এবং আরও ২৭৬ টন রাসায়নিক আমদানি করা হয়। এসব রাসায়নিকের মধ্যে পারক্লোরেটজাতীয় উপাদান রয়েছে, যা রকেটের জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে মাসিক আমদানির পরিমাণ ৪৭ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে আসে। তবে মে মাসে তা আবার বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছায়।

রাশিয়া থেকে ৭৬ লাখ ডলার মূল্যের ডেটোনেটরও পাঁচটি চালানে ইরানে পৌঁছায়। এর মধ্যে সর্বশেষ চালানটি আসে জুনে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য। এর সর্বশেষ চালানটি পৌঁছায় জুনে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে অবরোধ স্থগিত করার কয়েক দিন পর।

ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে—এমন কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত লেদ মেশিন ও ইলেকট্রন-বিম ফার্নেসের মতো নির্ভুল যন্ত্রপাতিও কিনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিক্রিয়া

রয়টার্সের অনুসন্ধানের তথ্য পর্যালোচনা করা বিশেষজ্ঞরা একে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বহর পুনর্গঠনে ‘শিল্প-পর্যায়ের উদ্যোগ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, আমদানি করা অনেক উপাদান দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য। অর্থাৎ সামরিক কাজের পাশাপাশি বেসামরিক উদ্দেশ্যেও এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব।

রয়টার্সের অনুসন্ধান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক লাইফলাইন বিচ্ছিন্ন করেছে।

তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া, সামরিক ও অস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবেশের জন্য শাসকগোষ্ঠী মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। তবে আমরা সব সময় তাদের চেয়ে ১০ ধাপ এগিয়ে আছি।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির নকশা তৈরিতে সহায়তাকারী সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি এই ব্যবস্থাকে ইরানের সামরিক বাহিনীর ‘লাইফলাইন’ এবং তাদের বাণিজ্যের ‘সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা’ বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি চলমান সংঘাতের সময় এবং এর বহু বছর আগে থেকেই শাসকগোষ্ঠীর সামরিক বাহিনীর লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। এটি ইরানের সামরিক বাণিজ্যের সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা।’

অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বিষয়ে তারা অবগত নয়। রয়টার্সকে ফ্যাক্সে পাঠানো এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণভাবে চীনকে জড়ানোর চেষ্টা বা চীনের সুনাম ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টার আমরা দৃঢ় বিরোধিতা করি।’

এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইরানের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, হোয়াইট হাউস, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমএইচ

যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগা দিয়ে ইরানের ২০০ কোটি ডলারের সামরিক আমদানি

প্রকাশিত : ০৭:৩১:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সামরিক সরঞ্জাম আমদানির জন্য পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থার একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরান। এসব সংস্থার নামের শুরুতে রয়েছে ‘এমওডি’। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারি ট্রাক আমদানি করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত চলাকালে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে ইরান। এসব অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণে দেশটি কীভাবে সক্ষম হচ্ছে, তার একটি চিত্র পাওয়া গেছে এই অনুসন্ধানে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অত্যন্ত সুসংগঠিত এই সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং দেশটির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বুনিয়াদ’ নামে পরিচিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন পণ্যের চালান ও জাহাজ পরিবহণের নথিতে এ নেটওয়ার্কের আর্থিক লেনদেনের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত এসব সংস্থার কোনো একটির বিরুদ্ধেও পশ্চিমা সরকারগুলো নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে—এমন প্রমাণ তারা পায়নি।

যেভাবে কাজ করে গোপন নেটওয়ার্ক

ইসরাইলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ২৪০ অ্যানালিটিকসের সঙ্গে যৌথভাবে করা অনুসন্ধানে রয়টার্স প্রথমবারের মতো এই নেটওয়ার্কের পরিচয় প্রকাশ করেছে। এটি তেহরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নেটওয়ার্কের সংস্থাগুলোর নামের শুরুতে থাকে ‘এমওডি’ অথবা ফারসি ভাষায় ‘ভিওডিজেএ’। এরপর পাঁচ বা ছয় অঙ্কের একটি সংখ্যা কথায় লেখা থাকে। সব সংস্থার ঠিকানা ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তেহরানের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি সংস্থার প্রতিষ্ঠার তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি—যেদিন আয়াতুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

তবে করপোরেট নথিতে দেখা গেছে, এসব সংস্থার অধিকাংশই প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। সে সময় নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ও মুদ্রাব্যবস্থা চাপে পড়েছিল।

তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত পূরণ করতে এসব সংস্থা বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী ও বিদেশি ভুয়া কোম্পানির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। সম্মিলিতভাবে এসব মধ্যস্থতাকারীকে ‘ট্রাস্টি’ বলা হয়।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা চালানের ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রে লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে ‘মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়াই’। ফলে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থের সরাসরি লেনদেন কম হয়েছে, যা নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার নজরে আসার ঝুঁকিও কমায়।

এসব সংস্থার মাধ্যমে আমদানি করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও ভারি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান। এসব পণ্য চীন, রাশিয়া ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

যেভাবে শনাক্ত হলো নেটওয়ার্ক

২৪০ অ্যানালিটিকসের অর্থনীতিবিদ নোয়াম বিনস্টক ২০২৫ সালের জুনে এই নেটওয়ার্কের ধরন শনাক্ত করেন। সে সময় তিনি ব্যাংক সেপাহের ফাঁস হওয়া কিছু নথি বিশ্লেষণ করছিলেন। আইআরজিসির সদস্যদের বেতন-ভাতা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এই ব্যাংকের নথিগুলো টেলিগ্রাম ও উইকিইরান ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে পড়েছিল।

নথিতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ৩৬টি সংস্থার কাছে বৈদেশিক মুদ্রায় ১২০ কোটি ডলার ছিল। অন্য সংস্থাগুলোর কাছে স্থানীয় মুদ্রায় ছিল প্রায় ১৮০ কোটি ডলার।

পরে বিনস্টক জানতে পারেন, এসব সংস্থা তেল বিক্রির অর্থ গ্রহণ করে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম কিনছে। প্রতিটি সংস্থার জন্য রয়েছে ১১ অঙ্কের আলাদা পরিচিতি নম্বর। জাহাজ পরিবহনের নথি, চালান ও ব্যাংক হিসাবেও একই নম্বর ব্যবহৃত হওয়ায় ভুয়া কোম্পানির আড়ালেও নেটওয়ার্কটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

এরপর প্রায় ১৯ হাজার আমদানি নথির একটি অংশ জাহাজ চলাচলের কাগজপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও, স্যাটেলাইট চিত্র ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করে রয়টার্স।

সবচেয়ে বড় ক্রেতা এমওডি ৩৪৬৪২৮

নেটওয়ার্কের সংস্থাগুলোর মধ্যে এমওডি ৩৪৬৪২৮ বিশেষভাবে নজরে এসেছে। ২০২৩ সালের মার্চে শেষ হওয়া এক বছরে সংস্থাটির আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। এতে সংস্থাটি ইরানের শীর্ষ ১০ আমদানিকারকের তালিকায় উঠে আসে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সংস্থাটি ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান, বিস্ফোরক ও অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে সংস্থাটি চীন থেকে ৮৮৬ টন রাসায়নিক আমদানি করে। এর মধ্যে ছিল সোডিয়াম ক্লোরেট ও বিভিন্ন পারক্লোরেট, যা কঠিন জ্বালানিচালিত রকেটের জ্বালানি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। এসব পণ্য বান্দর আব্বাস বন্দর দিয়ে ইরানে প্রবেশ করে।

রয়টার্সের উদ্ধৃত সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল দক্ষিণ ইরানের শহীদ রাজায়ি বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পেছনে এসব চালানের একটি থেকে আসা সোডিয়াম পারক্লোরেটের ভূমিকা ছিল। বন্দরের কনটেইনারে থাকা রাসায়নিকটিতে আগুন ধরে বিস্ফোরণ ঘটে বলে সূত্রগুলোর দাবি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, রাসায়নিকগুলো সংরক্ষণ করেছিল সিনা পোর্ট অ্যান্ড মেরিন সার্ভিসেস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি বুনিয়াদ মোস্তাজাফানের মালিকানাধীন। বহু বিলিয়ন ডলারের এই ফাউন্ডেশন সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ওই বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন।

ট্রাক ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান আমদানি

এমওডি ৩৪৬৪২৮ মোট ৪৩৫টি ইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে। সামরিক বাহিনী এ ধরনের ট্রাককে ছদ্মবেশী চলমান ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহার করে।

এর আগে ২০২২ সালে একই ধরনের ছয়টি ট্রাক কেনা হয়েছিল। পরে সেগুলো সাহারা থান্ডার নামের একটি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছায়। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের অভিযোগে ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এ ছাড়া সংস্থাটি হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার পিকআপ আমদানি করেছে। আইআরজিসি এসব গাড়িতে ভারি মেশিনগান সংযুক্ত করে ব্যবহার করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইভেকো জানিয়েছে, ইরানে তাদের কোনো গাড়ি ব্যবহৃত হয়ে থাকলে তা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অন্যদিকে টয়োটা বলেছে, তারা ইরানে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করে না।

যুদ্ধের মধ্যেও অব্যাহত আমদানি

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও ইরানে সামরিক সরঞ্জাম ও কাঁচামাল সরবরাহ অব্যাহত ছিল বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

যুদ্ধ শুরুর আগের কয়েক সপ্তাহে ইরান চীন থেকে ৯৩ টন টাইটানিয়াম আমদানি করে। উচ্চ শক্তিসম্পন্ন এই ধাতু ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো ও রকেটের মোটরের আবরণ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে অস্ত্র ও নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া চীন থেকে ২৬৮ টন নাইট্রোসেলুলোজ এবং আরও ২৭৬ টন রাসায়নিক আমদানি করা হয়। এসব রাসায়নিকের মধ্যে পারক্লোরেটজাতীয় উপাদান রয়েছে, যা রকেটের জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে মাসিক আমদানির পরিমাণ ৪৭ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে আসে। তবে মে মাসে তা আবার বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছায়।

রাশিয়া থেকে ৭৬ লাখ ডলার মূল্যের ডেটোনেটরও পাঁচটি চালানে ইরানে পৌঁছায়। এর মধ্যে সর্বশেষ চালানটি আসে জুনে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য। এর সর্বশেষ চালানটি পৌঁছায় জুনে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে অবরোধ স্থগিত করার কয়েক দিন পর।

ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে—এমন কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত লেদ মেশিন ও ইলেকট্রন-বিম ফার্নেসের মতো নির্ভুল যন্ত্রপাতিও কিনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিক্রিয়া

রয়টার্সের অনুসন্ধানের তথ্য পর্যালোচনা করা বিশেষজ্ঞরা একে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বহর পুনর্গঠনে ‘শিল্প-পর্যায়ের উদ্যোগ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, আমদানি করা অনেক উপাদান দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য। অর্থাৎ সামরিক কাজের পাশাপাশি বেসামরিক উদ্দেশ্যেও এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব।

রয়টার্সের অনুসন্ধান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক লাইফলাইন বিচ্ছিন্ন করেছে।

তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া, সামরিক ও অস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবেশের জন্য শাসকগোষ্ঠী মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। তবে আমরা সব সময় তাদের চেয়ে ১০ ধাপ এগিয়ে আছি।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির নকশা তৈরিতে সহায়তাকারী সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি এই ব্যবস্থাকে ইরানের সামরিক বাহিনীর ‘লাইফলাইন’ এবং তাদের বাণিজ্যের ‘সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা’ বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি চলমান সংঘাতের সময় এবং এর বহু বছর আগে থেকেই শাসকগোষ্ঠীর সামরিক বাহিনীর লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। এটি ইরানের সামরিক বাণিজ্যের সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা।’

অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বিষয়ে তারা অবগত নয়। রয়টার্সকে ফ্যাক্সে পাঠানো এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণভাবে চীনকে জড়ানোর চেষ্টা বা চীনের সুনাম ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টার আমরা দৃঢ় বিরোধিতা করি।’

এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইরানের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, হোয়াইট হাউস, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমএইচ